কিছুদিন ধরে প্রাসাদ পুরো ফাঁকা। রিসেপশনিস্ট, আমার পিওন, ক্লিনার কেউই নেই। খালি আছে আমার পিএস জমিল।
সকাল সকাল জমিল আমাকে বল্ল, ম্যাম! জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
কার সাথে? জানতে চাইলাম।
আমাদের পাশের শহরে হট্টগোল চলছে। টিকটিকিদের রাজা রনবীর এসেছেন। মনে হয় আমাদের সাহায্য চাইছেন।
আসতে বল।
রাজা রনবীর এসেই খুব অস্থির ভাবে বল্ল, আপাজান! হাই-হ্যালোতে সময় নষ্ট করবো না। আমার সতের জন সিপাহি গায়েব।
বল কী! খুব অবাক হয়ে যাই।
আগের মাসে আপনার মেয়ের বিয়েতে এই সতেরজনকে পাঠিয়েছিলাম। রান্নাঘর বিভাগ থেকে সুস্বাদু গরম গরম খাবারসহ ওরা এসেছিল। আমি ওদের এখানে আসার খবর ঠিকই পেয়েছি। কিন্তু ফিরে ওরা যায়নি।
খুব ভাবনায় পড়লাম। ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছি দেখছি।
রাজা রনবীর বল্ল, এক মাস অপেক্ষা করলাম। ভাবলাম, বিয়ের আনন্দে হয়তো মেতে আছে ওরা। কিন্তু, আজ খবর পেলাম, তেলাপোকা রানী হলুদিয়া, মানে আপনার প্রাসাদও নাকি খালি। এমনকি আপনার মেয়েজামাইও নাকি তিন রাত ধরে গায়েব।
আমার মেয়েজামাই গায়েব, ইয়ে মানে…
আপাজান! সেই সৈনিকদের পরিবার রাস্তায় নেমেছে। ‘টিক টিক বিচার চাই’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে। (টিক টিক বলতে টিকটিকিদের রাজা ‘ঠিক ঠিক’ বুঝিয়েছে)
যা বুঝলাম, গুমের জন্য রাজাকে দায়ী করছে ওরা।
আপাজান! বিষয়টা বিবেচনা করবেন প্লিজ।
আমি আজই দেখব ব্যাপারটা।
আশ্বস্ত হয়ে চলে গেলো রাজা রনবীর।
ডাকলাম আমার পিএসকে।
জমিল! আর কাউকে তো দেখছি না। চল, আমি আর তুমি আগে রান্নাঘর বিভাগে ঢুঁ মেরে আসি। সৈনিকদের শেষ বার ওখানেই দেখা গেছে।
বেশ লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে গেলাম রান্নাঘর বিভাগে। কী অবস্থা সেখানে! মাছের কাঁটা, বিস্কুটের টুকরো, আর নানা ধ্বংসস্তূপ পার হয়ে ঢুকলাম ভেতরে। জমিল নিজের অজান্তেই ধাক্কা খেল একটা মাংসের হাড়ের সাথে। সাথে সাথে ঘূর্ণিঝড় ক্যাটারিনার বেগে কে যেন ছুটে এসে আমাদের দুজনকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। ওমা, কী বাতাস! জ্ঞান হারানোর আগে খালি দেখলাম দুটো চকচকে ধারালো দাঁত। ঠিক যেন হাতির শুঁড়!
জ্ঞান ফিরতেই দেখি, আমি সেই নিষিদ্ধ এলাকায় আছি, যেখানে আসতে বার বার মানা করতেন আমার গুরুজনেরা। বিদঘুটে গন্ধ, চারিদিকে বালি, মাছের কাঁটা, আমার পরিচিত কিছু ইঁদুর ভাইয়ের মাথা এবং গুনে গুনে ঠিক সতেরটি টিকটিকির মমি হয়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত শরীর। আমার তেলতেলে শরীর ভিজে গেল আমারই চোখের পানিতে।
ধাম!
বিকট শব্দ হল। আমি মরে পড়ে থাকার ভান করলাম। একটু পর চোখের কোণা দিয়ে দেখতে পেলাম, ধবধবে সাদা সেই দানোকে। গল্পে শুনেছি এর কথা। মিশরের ভয়ংকর বেড়াল দেবতা ফিনিস-এর বংশধর। নাম যার মিনারভা। ওর হাতের থাবার ভেতর এ কে? এ যে আমার জমিল! এতিম ছেলেটা বাবামাকে হারিয়েছে এই রাক্ষসের হাতে। ওরও কি তবে একই পরিণতি হবে? হায়রে ঈশ্বর! এ তোমার কেমন খেলা?
জমিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। ওর দুটি পা আমার মুখের সামনে ছিটকে এসে পড়ল। ডানা বাতাসে উড়ছে।
দুটি তীক্ষ্ম জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ আমার দিকে তাকালো। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। সেই তোড়ে আমি উড়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে উড়তে দিলো না।


